এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (EPFO) গত মঙ্গলবার ১৫টি নতুন ব্যাঙ্কের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার ফলে সরাসরি সংগ্রহ ব্যবস্থার আওতায় মোট ব্যাঙ্কের সংখ্যা ৩২-এ পৌঁছেছে। এই নতুন প্যানেলভুক্ত ব্যাঙ্কগুলি বার্ষিক প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকার সংগ্রহ সরাসরি পরিচালনা করবে এবং যেসব নিয়োগকর্তারা এই ব্যাঙ্কগুলিতে তাদের অ্যাকাউন্ট রাখেন, তারা সরাসরি তাদের মাসিক অবদান পরিশোধ করতে পারবেন। এর আগে ইপিএফও ১৭টি ব্যাঙ্ককে প্যানেলভুক্ত করেছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ড. মনসুখ মান্ডবিয়া এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং এমএসএমই বিষয়ক কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শোভা কারান্দলাজে।
EPFO-র ভূমিকা ও সামাজিক নিরাপত্তা
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ড. মনসুখ মান্ডবিয়া এই অনুষ্ঠানে বলেন, ইপিএফও-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলি দেশের ‘নয়া ভারত’ গঠনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি জানান, ইপিএফও-র প্রায় ৮ কোটি সক্রিয় সদস্য এবং ৭৮ লক্ষেরও বেশি পেনশনভোগী রয়েছেন, যারা এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, “আমি আনন্দিত যে ইপিএফও তার সুবিধাভোগীদের জন্য ৮.২৫ শতাংশ সুদের হার দিচ্ছে। ব্যাঙ্কগুলির এই অংশগ্রহণ ইপিএফও-র পরিষেবা প্রদানের দক্ষতা আরও বাড়াবে এবং সুশাসনের উন্নতি ঘটাবে।”
মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইপিএফও রেকর্ড ৬ কোটিরও বেশি দাবি নিষ্পত্তি করেছে, যা গত বছরের (২০২৩-২৪) ৪.৪৫ কোটি দাবির তুলনায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ইপিএফও-র ক্রমবর্ধমান দক্ষতা এবং সদস্যদের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করে।
কেন্দ্রীভূত পেনশন পেমেন্ট সিস্টেমের সুবিধা
মন্ত্রী মান্ডবিয়া ইপিএফও-র সাম্প্রতিক সংস্কারগুলির মধ্যে কেন্দ্রীভূত পেনশন পেমেন্ট সিস্টেম (সিপিপিএস) চালু করার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “এই সিস্টেমটি ৭৮ লক্ষেরও বেশি পেনশনভোগীদের জন্য একটি বড় সুবিধা নিয়ে এসেছে। এখন তারা দেশের যে কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তাদের পেনশন গ্রহণ করতে পারবেন। আগে পেনশনভোগীদের একটি নির্দিষ্ট জোনাল ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট থাকতে হতো, কিন্তু এই বাধ্যবাধকতা এখন তুলে দেওয়া হয়েছে।” এই সংস্কার পেনশনভোগীদের জন্য পেনশন গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ এবং সুবিধাজনক করে তুলেছে।
অটো ক্লেম সেটেলমেন্ট: দ্রুততর পরিষেবা
ইপিএফও-র আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংস্কার হল অটো ক্লেম সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়া। মন্ত্রী জানান, “অটো-প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে এখন দাবি নিষ্পত্তি মাত্র তিন দিনে সম্পন্ন হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমরা এই সিস্টেমের মাধ্যমে ২.৩৪ কোটি দাবি নিষ্পত্তি করেছি, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮৯.৫২ লক্ষ দাবির তুলনায় ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।” এই দ্রুততর প্রক্রিয়া সদস্যদের জন্য সময় সাশ্রয় করেছে এবং ইপিএফও-র পরিষেবার মান উন্নত করেছে।
ইপিএফও-র আর্থিক সংগ্রহ ও দক্ষতা
ইপিএফও বিশ্বের বৃহত্তম সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মধ্যে একটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০ মার্চ পর্যন্ত ইপিএফও নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে ১.২৫ কোটি ইলেকট্রনিক চালান কাম রিটার্ন (ইসিআর) এর মাধ্যমে ৩.৪১ লক্ষ কোটি টাকার অবদান সংগ্রহ করেছে। নতুন ব্যাঙ্কগুলির প্যানেলভুক্তি ইপিএফও-র সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আরও সুগম করবে। এটি নিয়োগকর্তাদের জন্য একটি অ্যাগ্রিগেটর পেমেন্ট মেকানিজমের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে, যা লেনদেনে বিলম্ব কমাতে এবং অপারেশনাল দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
আর্থিক সুবিধা ও বিনিয়োগের সুযোগ
নতুন ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে সরাসরি সংগ্রহ ব্যবস্থার ফলে ইপিএফও আর্থিক সুবিধা পাবে। প্যানেলভুক্ত ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ টি+১ দিনে বিনিয়োগের জন্য উপলব্ধ হবে, যেখানে অ্যাগ্রিগেটরের মাধ্যমে এটি টি+২ দিনে উপলব্ধ হতো। এছাড়াও, এটি ইপিএফও-র জন্য নন-প্যানেলভুক্ত ব্যাঙ্কগুলিতে সদস্যদের অ্যাকাউন্টের নাম যাচাইয়ের জন্য প্রদেয় খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে। এই উদ্যোগটি নিয়োগকর্তাদের জন্য ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ এবং ‘ইজ অফ প্রোভাইডিং সার্ভিস’ উভয়ই উন্নত করবে এবং সদস্যদের জন্য অবদান পরিশোধে বিলম্ব কমিয়ে সুবিধা প্রদান করবে।
নিয়োগকর্তাদের জন্য সুবিধা
নতুন ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে সরাসরি সংযোগের ফলে নিয়োগকর্তারা তাদের অবদান পরিশোধ সংক্রান্ত অভিযোগ বা সমস্যার জন্য সরাসরি এই ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। এটি নিয়োগকর্তাদের জন্য একটি স্বচ্ছ এবং দ্রুত সমাধান প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে। ইপিএফও-র এই পদক্ষেপ নিয়োগকর্তা এবং সদস্যদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে, যা সামগ্রিকভাবে সংস্থার কার্যকারিতা বাড়াবে।
ইপিএফও ৩.০-এর দিকে অগ্রসর
মন্ত্রী মান্ডবিয়া জানান, ইপিএফও বর্তমানে ইপিএফও ৩.০-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য হল সংস্থাটিকে ব্যাঙ্কগুলির মতো সহজলভ্য এবং দক্ষ করে তোলা। তিনি বলেন, “ইপিএফও ২.০১-এর সাম্প্রতিক বাস্তবায়ন আমাদের দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি এনেছে। আমরা গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়াতে এবং পরিষেবার মান উন্নত করতে ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছি।” এই দিকে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে ইপিএফও তার সদস্যদের জন্য আরও আধুনিক এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব পরিষেবা প্রদানের লক্ষ্য নিয়েছে।
ইপিএফও-র এই নতুন উদ্যোগ দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। ১৫টি নতুন ব্যাঙ্কের প্যানেলভুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ প্রক্রিয়া সহজতর হবে, নিয়োগকর্তাদের জন্য লেনদেন দ্রুততর হবে এবং সদস্যরা তাদের অবদানের সুবিধা আরও দ্রুত পাবেন। কেন্দ্রীভূত পেনশন পেমেন্ট সিস্টেম এবং অটো ক্লেম সেটেলমেন্টের মতো সংস্কারগুলি ইপিএফও-র প্রতিশ্রুতি এবং দক্ষতার প্রমাণ। এই পদক্ষেপগুলি ভারতের ‘বিকশিত ভারত’ গঠনের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।